অনেকে অনেক ভাবে ব্র্যান্ডকে সজ্ঞায়িত করতে পারেন, কিন্তু আমি সহজভাবে বুঝি ব্র্যান্ড মানে নিজের বা আমার সেবার পরিচিতি। যে কেউ আমাকে দেখলে বা আমার প্রোফাইল দেখলেই যেনো বুঝেতে পারে আমি কী করি, আমার কাজের দক্ষতা কেমন ইত্যাদি। আমেরিকার মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ব্র্যান্ড বলতে এমন কোন নাম, শব্দ, ডিজাইন, প্রতীক বা অন্য কোন ফিচার বোঝায় যা কোন একজন বিক্রেতার পণ্য বা সেবাকে অন্যান্য পণ্য বা সেবা থেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করে। অর্থাৎ এটি হচ্ছে এমন একটি চলমান প্রক্রিয়া যা আপনার নিজের বা আপনার প্রতিষ্ঠানের বা আপনার সেবার জন্য বাজারে পরিচিতির মাধ্যমে একটা জায়গা তৈরী করে নেয়।

কোন কোন কাজের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজনঃ

আমরা আমাদের জীবনের সাথে জড়িত যে কোন কাজের জন্যই ব্র্যান্ডিং করতে পারি। কারণ ব্র্যান্ডিং বা প্রচার ছাড়া আপনি আপনার কাজের বা সেবার মাধ্যমে আয়ের সফলতা আনতে পারবেন না। তাই আপনার কাজের সাথে জড়িত যে কোন পণ্য বা সেবারই ব্র্যান্ডিং করতে পারেন। যেমনঃ

১. ফ্রিল্যান্সিং

২. ফেসবুক পেজ

৩. ট্রাভেল এজেন্সি

৪. এ্যাপ ব্যবসায়

৫. রিসোর্ট ব্যবসায়

৬. কৃষি পণ্য

 

চলুন দেখে নেয়া যাক, আমরা কীভাবে আমাদের ব্র্যান্ডিং করতে পারিঃ


  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
  • পরিপূর্ণ প্রোফাইল তৈরি করা
  • সোসাল মিডিয়া এ্যাকাউন্টে পোষ্ট করা
  • বিভিন্ন গ্রুপে যোগদান করা
  • স্লোগান অথবা ট্যাগলাইন
  • পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট
  • নিজের ব্র্যান্ড এর নাম নির্বাচনের প্দ্ধতি

ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারসহ যে কোন পেশাগত জীবনেই ব্র্যান্ডিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ । কারণ এখানে নিজের ঢোল নিজেকেই পেটাতে হয়। বর্তমান সময়ে আপনাকেই এগিয়ে যেতে হবে আপনার পণ্য নিয়ে না হলে আরেকজন এসে আপনার জায়গা বা কাজ নিয়ে যাবে। তাই অনলাইনে আমাদের এমনভাবে নিজেদের পরিচিতি বা ব্র্যান্ডিং করতে হবে যেনো আমার ক্লায়েন্ট আমাকে সহজেই খুঁজে পায়।

ব্র্যান্ডিং এর মাধ্যমে আমরা আমাদের কাজের নমুনা, বৈশিষ্ট ‍তুলে ধরতে পারি যা আমাদের ক্লায়েন্টকে আমাদের কাজের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে। একমাত্র ব্র্যান্ডিংই পারে অন্যদের কাজের চেয়ে আমাদের কাজকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে এবং গুগুল সার্চে সবার আগে আমার নাম বা আমার পোর্টফোলিও ওয়েব সাইটকে নিয়ে আসতে।

আমরা যদি নিয়মিত ব্র্যান্ডিং এর পিছনে সময় ব্যয় করি তাহলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা আমাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তাদের আস্থা অর্জন করা যায়। আর ক্লায়েন্টের বা কমিউনিটির আস্থা অর্জন করতে পারলে তারা বারবার আমার ব্র্যান্ডের কাছেই ফিরে আসবে।

আমরা কীভাবে আমাদের ব্র্যান্ডিং করতে পারিঃ

আমরা অনেকেই এই ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দেই না এই ভেবে যে আমি কাজ শিখতেছি, আমার কাজ এমনি এমনিই আসবে । আসলে ব্যাপারটা আর এরকম নেই এখন । আপনি যতই ভালো কাজ করুন না কেন আপনাকে নিজের গুণাবলী আর সৃজনশীলতা দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে হবে। সকলের কাছে নিজের পরিচিতি এবং নিজের দক্ষতার মাধ্যমে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং তৈরি করতে হবে। আমার কাছে ব্যক্তিগত পরিচিতি বা ব্র্যান্ডিং এর জন্য নিচের পদ্ধতিগুলো খুবই কার্যকরী মনে হয়েছেঃ

১. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমঃ

কোন রকম খরচ না করেই আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের ব্র্যান্ডিং শুরু করতে পারি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ

  • ফেসবুক
  • টুইটার
  • লিঙ্কডইন
  • ইন্সটাগ্রাম
  • পিন্টারেষ্ট
  • গুগল প্লাস
  • ইউটিউব
  • টাম্বলার
  • স্লাইডশেয়ার
  • এবাউটমি
  • ডট.মি
  • ফ্লিকার
  • বিহ্যান্স
  • ড্রিবল


এসব সোসাল প্লাটফর্মে যদি আপনি আপনার কাজের বা ডিজাইনের পোষ্ট দেন তাহলে তা অন্যরা জানতে পারবে। ফলে তাদের কাছে আপনার ও আপনার কাজের গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং সবাই আপনার কাজ, আগ্রহ, সামর্থ্য ও যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে পারবে। আমাদের দেশে ও বিদেশে এমন অনেক কোম্পানী আছে যারা সোসাল মিডিয়া প্রোফাইল সার্চ করে তার কাঙ্খিত কর্মী খুঁজে বের করে। তবে উপরোক্ত সোসাল মিডিয়া সাইটে প্রজেক্ট আপলোডের ক্ষেত্রে আপনাকে প্রচুর সময় নিয়ে একটি সুন্দর ও নান্দনিক উপস্থাপন করতে হবে। উপস্থাপনের সময় মার্জিতভাবে আপনার প্রজেক্টের বিষয়, গবেষনা ও বিশদ বর্ণনা দিতে হবে। আর এরকম কাজ করিয়ে নিতে হলে আপনার সাথে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যও দিয়ে দিতে হবে।

২.পরিপূর্ণ প্রোফাইল তৈরি করাঃ

ব্র্যান্ডিং এর পূর্ব শর্ত হলো একটি পরিপূর্ণ প্রোফাইল তৈরি করা এবং যথেষ্ঠ সময় নিয়ে নির্ভুল তথ্য দিয়ে প্রোফাইটি সাজানো। যেনো কেউ আপনার প্রোফাইলে ভিজিট করলে আপনার কাজ ও দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পারে। বিভিন্ন সোসাল মিডিয়া পেজে আপনার উপস্থাপিত ও প্রকাশিত তথ্য ও ছবির মধ্যে যেনো সামঞ্জস্য থাকে। আপনার প্রোফাইলের নামটি হতে হবে আপনার ”প্রকৃত নাম” ও ছবি হতে হবে হাস্যোজ্জল। অনেকে প্রোফাইলের নাম দেয়ঃ একাকী পৃথিবী, অতৃপ্ত আত্মা, আলো ছায়া, ইনোসেন্ট বয়, কষ্টের জীবন ইত্যাদি। এরকম নামে কখনোই প্রোফাইল তৈরি করা যাবে না।

৩. সোসাল মিডিয়া এ্যাকাউন্টে পোষ্ট করাঃ

একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার বা ওয়েব ডিজাইনার প্রতিনিয়তই কোন না কোন ডিজাইন করে থাকে। কারণ ডিজাইন শিখার শুরুতে আমরা অনেক কপি করি এবং পরে নিজের কনসেপ্ট ডেভেলপ হলে নিজে থেকে ডিজাইন শুরু করি। আপনার করা প্রতিদিনের ডিজাইনগুলো সোসাল মিডিয়াতে পোষ্ট করা শুরু করুন। এতে করে আপনার কাজগুলো সবাই দেখতে পাবে এবং সবার মতামতও জানতে পারবেন। আপনি যদি কোন ওয়ার্কশপে অংশ নিয়ে নতুন কোন কাজ শিখে থাকেন তার সম্পর্কে পোষ্ট করতে পারেন অথবা শিক্ষামূলক কোন প্রবন্ধ আপনার পোষ্টে দিতে পারেন। এতে আপনার সৃজনশীলতা ও আন্তরিকতা সম্পর্কে সবাই জানতে পারবে। আজকাল অনেক উদ্দোক্তা রয়েছেন যারা ফেসবুকে পেজ খুলে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ব্যবসায় করে পরিচালনা করে থাকেন। তারা নিয়মিত তাদের পেজে বিভিন্ন পণ্যের পোষ্ট দিয়ে থাকেন। তাদের এসকল পোষ্টের মাধ্যমেও তাদের পণ্যের ব্র্যান্ডিং করতে পারেন।

৪.বিভিন্ন গ্রুপে যোগদান করাঃ

ডিজাইন শিখা, ক্ষুদ্র উদ্দোক্তা কিংবা ফ্রিল্যান্সার কমিওনিটিতে নিজের পরিচিতি তৈরী করা ও ব্র্যান্ডিং এর জন্য বিভিন্ন গ্রুপে যোগ দেয়ার কোন বিকল্প নেই। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, অনেক গ্রুপে যোগ না দিয়ে বেছে বেছে সর্বোচ্চ দশটি গ্রুপে যোগ দিলেই যথেষ্ঠ। এসকল গ্রুপে সবাই যে সকল পোষ্ট করে সেগুলোতে যুক্তিসংগত মতামত দেয়া, কারো ডিজাইন পোষ্ট করলে তার সম্পর্কে মতামত দিয়ে তাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। সাথে নিজের ডিজাইনও নিয়মিত পোষ্ট করতে হবে। এভাবে এসকল গ্রুপে নিজেকে সবার কাছে গ্রহনযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। তথ্যবহুল ও প্রয়োজনীয় কনটেন্ট নিয়মিত পোষ্ট করা যা অন্যকে আপনার দিকে আকৃস্ট করবে। গ্রুপে যারা কিছু জানতে চায় তাদেরকে তার সমস্যার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করতে হবে।

৫. স্লোগান অথবা ট্যাগলাইনঃ

আপনার নিজস্ব ব্র্যান্ডের জন্য একটি সুন্দর ট্যাগলাইন তৈরী করে নিতে পারেন। খেয়াল রাখতে হবে ট্যাগলাইনটি যেনো আধুনিক হয় এবং আপনার কাজ ও দক্ষতার সাথে মিল থাকে। যেমন ডিজাইনাররা যে সকল ট্যাগগুলো সাধারণতঃ ব্যবহার করে থাকে-  Creative Graphics Designer, The design solutions, Your Creative house । আমি শুধু উদাহরণ হিসেবে কয়েকটা ট্যাগের নাম লিখলাম। আপনারা পছন্দমতো ট্যাগ নির্বাচন করে নিবেন। আপনার পণ্য বা সেবার ধরণ অনুযায়ী আপনাকে সৃজনশীল স্লোগান বা ট্যাগলাইন তৈরি করে নিতে হবে।

 ৬. পোর্টফোলিও ওয়েবসাইটঃ

ব্রান্ডিং এর আরেকটি পদক্ষেপ হচ্ছে একটি পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরী করা। আপনি বিভিন্ন সোসাল মিডিয়াতে আপনার ব্র্যান্ডিং করেছেন কোন টাকা পয়সা খরচ না করে, কিন্তু পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরীর জন্য আপনাকে কিছু টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। তবে আমরা ফ্রিতেও অনেক ধরণের প্লাটফর্মে আমাদের পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারি। যেমনঃ ব্লগার, বিহ্যান্স, ফ্লিকার ইত্যাদি।

 পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরীর ধাপগুলো এরকমঃ

১. একটি ডোমেইন কিনতে হবে ( যে নামে আপনার ওয়েবসাইটটি হবে)

২. হোষ্টিং নিতে হবে

৩. ব্র্যান্ড এর নাম ঠিক করতে হবে

৪. প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট তৈরী করতে হবে

৫. ওয়েবসাইটে পোষ্টের জন্য আপনার সেরা কাজের বা পণ্যের উপস্থাপন করতে হবে

পোর্টফোলিও ওয়েব সাইট যার যার কাজের ধরণ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

৭. নিজের ব্র্যান্ড এর নাম নির্বাচনের প্দ্ধতিঃ

প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে, তা হচ্ছে যে নামে আপনার পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট বা ব্র্যান্ডিং করতে চান তা নির্ধারণ করা। একটি ভালো নাম বা ডোমেইন নামের কিছু বৈশিষ্ট আছে। যেমনঃ

Ø  আপনার ব্র্যান্ডের বা ডোমেইন ছোট হতে হবে

Ø  কোন রকম ডিজিট ব্যবহার করা যাবেনা

Ø  ডট.কম নেয়ার চেষ্টা করতে হবে

Ø  সহজে উচ্চারণ করা যায়

Ø  সহজে মনে রাখা যায়

 

পরিশেষে বলতে চাই, আপনার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আপনার ব্র্যান্ডিং এর উপর গুরুত্ব দিয়ে আপনার কাজগুলো যত্ন সহকারে উপস্থাপন করুন। একটা সময় পরে আপনার ব্র্যান্ডিং থেকেই আপনার ক্লায়েন্টরা আপনাকে খুঁজে বের করবে। আপনার পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরী করার জন্য অন্যদের পোর্টফোলিওগুলো গুগুলে রিসার্চ করুন। একটি ভালো থিম বা লে-আউট নির্বাচন করে ওয়েবসাইটটি বানানো শুরু করুন। আপনার ফ্রিল্যান্সিং সংক্রান্ত যে কোন পরামর্শ ও সাহায্যের জন্য আমাদের পেজে ও গ্রুপে যোগাযোগ করতে পারেন।আপনার ব্র্যান্ডিং শুভ হোক, গতিময় হোক আপনার পথচলা, এই প্রত্যাশায় শেষ করছি। ধন্যবাদ।